নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার গুরুত্ব | একটি উন্নত সমাজ গড়ার চাবিকাঠি
সম্পাদকীয় দল
Dec 18, 2025
একটি জাতি তখনই উন্নত হয় যখন তার নারীরা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়। জানুন নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে এবং কীভাবে নারী শিক্ষা সমাজ ও অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে।
ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।” এই উক্তিটি আজও ধ্রুব সত্য। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই যেখানে নারী, সেখানে নারীদের পিছিয়ে রেখে কোনো জাতির পক্ষে উন্নত হওয়া সম্ভব নয়।
নারীর ক্ষমতায়ন (Women's Empowerment) এবং শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষা ছাড়া যেমন প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়, তেমনি ক্ষমতায়ন ছাড়া নারীরা তাদের অধিকার ও মেধা বিকাশের সুযোগ পায় না। আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব কেন নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন সমাজের জন্য অপরিহার্য।
১. নারীর ক্ষমতায়ন আসলে কী? (What is Women's Empowerment?)
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে শুধুমাত্র নারীদের উচ্চপদে চাকরি করাকেই বোঝায় না। এর অর্থ হলো—নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া। যখন একজন নারী তার নিজের, পরিবারের এবং সমাজের মঙ্গলের জন্য স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তখনই প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটে। আর এই ক্ষমতায়নের প্রধান হাতিয়ার হলো শিক্ষা।
২. নারী শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রভাব (Importance of Women's Education)
শিক্ষা নারীদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে। নিচে নারী শিক্ষার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:
ক. সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি
একজন শিক্ষিত নারী তার জীবনের ভালো-মন্দ বিচার করতে পারেন। বাল্যবিবাহ রোধ, পরিবার পরিকল্পনা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
খ. অর্থনৈতিক মুক্তি
নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম শর্ত হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। শিক্ষিত নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের মাধ্যমে শুধুমাত্র নিজের পায়ে দাঁড়ান না, বরং দেশের জিডিপি (GDP) বা অর্থনীতিতেও বিশাল অবদান রাখেন। পরনির্ভরশীলতা দূর হলে নারীদের ওপর পারিবারিক ও সামাজিক নির্যাতন কমে আসে।
গ. সুস্থ ও শিক্ষিত প্রজন্ম গঠন
মায়েরা হলেন সন্তানের প্রথম শিক্ষক। একজন শিক্ষিত মা তার সন্তানের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিক্ষার ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত মায়েদের সন্তানদের মধ্যে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কম।
ঘ. সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ
সমাজে প্রচলিত যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতন এবং লিঙ্গ বৈষম্যের মতো কুসংস্কারগুলো দূর করতে নারী শিক্ষা প্রধান ভূমিকা পালন করে। একজন শিক্ষিত নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানেন।
৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর অগ্রগতি
বর্তমান বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে। শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, এবং খেলাধুলায় নারীরা এখন পুরুষের পাশাপাশি সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে। পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ আমাদের দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রেখেছে। তবে, এখনো গ্রামীণ জনপদে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
৪. আমাদের করণীয়
নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে আমাদের সকলের কিছু দায়িত্ব রয়েছে:
কন্যাশিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া রোধ করা।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।
পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।
নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষা কোনো দয়া বা সুযোগ নয়, এটি তাদের জন্মগত অধিকার। একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন এবং উন্নত সমাজ গড়তে হলে নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আসুন, আমরা সবাই মিলে নারী শিক্ষার পথ সুগম করি এবং নারীর ক্ষমতায়নে পাশে দাঁড়াই।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. নারীর ক্ষমতায়ন কেন জরুরি? সমাজের সুষম উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীর ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি।
২. নারী শিক্ষা কীভাবে দেশের অর্থনীতিতে সাহায্য করে? নারীরা শিক্ষিত হলে তারা জনশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তারা চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে আয় করে যা জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
৩. নারীর ক্ষমতায়নে প্রধান বাধা কী? সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তার অভাব, বাল্যবিবাহ এবং শিক্ষার অভাব হলো নারীর ক্ষমতায়নের প্রধান বাধা।